বাংলাদেশের স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মোগল স্থাপত্যশৈলীকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ফের  আজ উদ্বোধন হতে যাচ্ছে হোটেল  ইন্টারকন্টিনেন্টাল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পথপরিক্রমায় মুক্তিযুদ্ধসহ নানা ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হোটেল এই হোটেলটি। তাই তো প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে হোটেলটি সংস্কার করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হোটেলটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করার কথা রয়েছে।

          সংস্কারের পর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল

এর মাধ্যমেই দায়িত্ব ছেড়ে যাওয়ার প্রায় তিন যুগ পর ‘ইন্টারকন্টিনেন্টাল’ নামটি আবার নামফলক হয়ে যুক্ত হচ্ছে হোটেলটির গায়ে।

ইন্টারকন্টিনেন্টাল গ্রুপ ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত এই হোটেলের ব্যবস্থাপনায় ছিল। ইন্টারকন্টিনেন্টালের পর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আসে আন্তর্জাতিক হোটেল সেবাদানকারী আরেক প্রতিষ্ঠান ‘শেরাটন’। ২৮ বছর পর ২০১১ সালের এপ্রিলে শেরাটন চলে গেলে সরকারি কোম্পানি বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেড ‘রূপসী বাংলা’ নামে নিজেই হোটেলটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেয়। পরের বছর ইন্টারকন্টিনেন্টালের সঙ্গে চুক্তি সই করার দুই বছর পর ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে এর সংস্কারকাজ শুরু হয়।ইন্টারকন্টিনেন্টাল কর্তৃপক্ষ বলছে, সংস্কার কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সংগতি রেখে কক্ষের আয়তনে এসেছে পরিবর্তন। আসবাব, সুইমিং পুল, জিমনেসিয়ামের আধুনিকায়নসহ যুক্ত হয়েছে অন্যান্য সেবা। তবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে হোটেলটির নিবিড় সম্পৃক্ততাকে স্মরণে রেখে মূল কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। ব্যবহার করা হয়েছে একই রং,যেমনটি শুরুর সময়ে ছিল।

 

                            রুপসি বাংলা হোটেল

সংস্কারের পর হোটেলটির কক্ষসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২৬টি। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিটি ৪০ বর্গমিটার আয়তনের ২০১টি ডিলাক্স, প্রিমিয়াম ও এক্সিকিউটিভ কক্ষ, ৬০ বর্গমিটার আয়তনের পাঁচটি সুপিরিয়র স্যুইট, একই আয়তনের ১০টি ডিলাক্স স্যুইট, ৭৫ বর্গমিটার আয়তনের পাঁচটি ডিপ্লোমেটিক স্যুইট এবং ১৫০ বর্গমিটার আয়তনের পাঁচটি প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুইট। হোটেলের দুটি বলরুম ও সাতটি সভাকক্ষ নির্মিত হয়েছে ২১ হাজার বর্গফুট  জায়গাজুড়ে। প্রধান বলরুমটির নাম রাখা হয়েছ রূপসী বাংলা। এ ছাড়া তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত আধুনিক সুইমিং পুল, জিমনেসিয়াম, স্পাসহ নানা সুবিধা থাকছে অতিথিদের জন্য। সংস্কার কাজে খরচ হয়েছে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা।

মুক্তিযুদ্ধের আগে-পরের বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন সংগ্রামে তখনকার নানা সংবাদপত্র ও নথিতে এই হোটেলটির কথা বিভিন্নভাবে উল্লেখ আছে। একাত্তরের ২৫ মার্চের আগে ৭০-এর নির্বাচন, ঘূর্ণিঝড়ের সময়েও হোটেলটি বিদেশি সাংবাদিকদের একটা বড় কেন্দ্র ছিল। ২৫ মার্চ এখান থেকে বিদেশি সাংবাদিকদের বের করে দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে সায়মন ড্রিংসহ আরেক আলোকচিত্র সাংবাদিক হোটেলের ভেতরেই পালিয়ে ছিলেন। যাঁরা ঢাকায় গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী হয়েছিলেন। এমনকি গণহত্যার রাতে জুলফিকার আলী ভুট্টোও এই হোটেল থেকে ঢাকাকে পুড়তে দেখেছেন।

একাত্তরের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গণহত্যা শুরু করার আগে ঢাকায় অবস্থানকারী সব বিদেশি সাংবাদিককে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আটকে ফেলা হয়। পরদিন তাঁদের বিমানবন্দরে নিয়ে তুলে দেওয়া হয় উড়োজাহাজে। কিন্তু সামরিক আইনের নির্দেশ অমান্য করে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সায়মন ড্রিং লুকিয়ে ছিলেন হোটেলে। ২৭ মার্চ সকালে কারফিউ উঠে গেলে হোটেলের কর্মচারীদের সহযোগিতায় ছোট্ট একটি মোটরভ্যানে করে ঘুরে দেখেন ঢাকার বিভিন্ন এলাকা।

পরে ঢাকায় দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো প্রথম দফার গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের প্রত্যক্ষ চিত্র উঠে আসে সায়মন ড্রিংয়ের প্রতিবেদনে। ‘ট্যাংকস ক্র্যাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তান’ শিরোনামের সেই প্রতিবেদন লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ৩০ মার্চ ছাপা হয়। এ প্রতিবেদন থেকে বিশ্ববাসী জানতে পারে পাকিস্তানি বাহিনীর সেদিনের বর্বরতার কথা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত সঞ্চারের প্রাথমিক মুহূর্ত ছিল সেটি।

কমেন্ট করে সাথেই থাকুন